COME TO www.dolchhut.org

১৬ অগাস্ট : সরোজ দরবার

১৬ অগাস্ট ভাগ্যিস খবরের কাগজের ছুটি। নচেত নিশ্চিত ফ্রন্ট পেজে বাসি আর পিছনের পাতায় কালো দিন- ১৬ অগাস্ট দিনটার হত এমনই বিড়ম্বনা। বাসির কথায় পরে আসি, আগে কালোদিনের ইতিবৃত্ত ঘেঁটে নেওয়া যাক। বছর ৩৪ আগের ঘটনা। নাহ চেনা ৩৪ এর কোনও ছায়া দেখে আঁতকে উঠবেন না, এখানে তথাকথিত রাজনীতির চালিয়াতি নেই। আছে বাঙালির বাঁধাভাঙা উচ্ছ্বাসে চালিত হয়েই ১৬ অগাস্ট ১৬ জন ফুটবলপ্রেমীর প্রাণ যাওয়ার কথা খেলা হয়েছিল মোহনবাগান-ইস্টবেঙ্গলে। মোহনবাগানের উইংয়ে ছিলেন, বিদেশ বসু আর মানস ভট্টাচার্জ। ইস্টবেঙ্গলের হয়ে ট্যাকল করছিলেন দিলীপ পালিত। দিলীপবাবুর এক ট্যাকলে বিদেশ বসু আঘাত পান। বড় ম্যাচ। উত্তেজনে চরম। বিদেশ রিয়্যাক্ট করে ফেলেন। রেফারি সুধীন চট্টোপাধ্যায় দুজনকেই লাল কার্ড দেখান। উত্তেজনার পারদ এতটাই চড়ে যে প্রায় সকলেই হুড়োহুড়ি করে মাঠ থেকে বেরোতে চাইছিলেন। এদিকে ইডেনের গেটগুলো ছিল বন্ধ। ফলে মারাত্মক দুর্ঘটনাটি ঘটে। পদপিষ্ট হয়ে মারা যান ১৬ জন। বাঙলার ফুটবল ইতিহাসে এটি একটি কালো দিন। প্রতিবছর নিয়ম করে কাগজে এ কথা লেখা হয়। শহীদ বেদীও আছে। নচিকেতা ঘোষের সুরে যে মান্না দে একদা গেয়েছিলেন, সব খেলার সেরা বাঙালির তুমি ফুটবল, সুপর্ণকান্তি ঘোষের সুরে তিনিই গেয়েছিলেন, খোকা বাড়ি ফিরল না। মনে করে এফএমওয়ালারা সে গান চালানও। কিন্তু তাতে বাঙালির কিছু যায় আসে না। এই সেদিনও সে ইট ছুঁড়ে মেহতাব হোসেনের মাথা ফাটিয়েছে। এই হল ১৬ অগাস্টের কালো কথা
অবশ্য বাকিটা যে ভালো কথা এমনটা নয়। কেননা ১৬ অগাস্ট অফিস যেতে হয়। ক্যালেন্ডারে লাল দাগ থাকে না। এ বছর অবশ্য টানা তিনদিনের ছোটখাটো একটা ট্রিপ হতেই পারে। তাই বলে তো প্রতি বছরের এমন কপাল ভালো থাকে না। তাই রোববারের পর সোমবারের সকালে যেমন এক ধরনের কালমেঘ অনুভূতি থাকে, ১৬ অগাস্টের কপালেও তাই জোটে। অবিশ্যি আগের তারিখটাতেই একটা গুরুতর দিন গেছে। হাজার ছুটি হলেও, সব ছুটি কি আর এক ছাঁচে ঢালা হয়? যত যাই বলা হোক, পাড়ার মোরে ‘মুক্তির মন্দিরও’ বাজতে শুরু করলেই একটা অদ্ভুত অনুভূতি হতে শুরু করে। শহীদ স্মরণে, আপনমরণে...বাকিটা আর শেষ হয় না। কী জেন একটা তালগোল পাকিয়ে যায়... সংবিধান...ব্রিটিশ মডেল...স্টেবিলিটি আর রেস্পন্সিবিলিটি... ঘাঁটা গণতন্ত্র...রাজনৈতিক কারবারী...ভারত,ইন্ডিয়া...এই ড্রাই ডে কেন রে আজ? অথচ এককালে, মানে যখন ডের ড্রাইয়ার ওয়েট হোয়ার ফারাক ছিল না, তকন তেরঙ্গা তরতর করে উঠে গেলে তিরতিরে একটা অনুভূতি হতই। আর উপর থেকে ফুলগুলো যখন ঝরে পড়ত মনে হত স্বাধীনতা যেন তার প্রিয় নাগরিকদের পুষ্পবৃষ্টি করছে। হায় পুষ্প! আমাদের অভিধানে তো ভস্মে ঘি ঢালারও একটা প্রবাদ শেষের দিকে আছে। মুখে যতই বলা হোক, আমরা সবাই রাজা, আসলে তো রাজাকে জালের আড়াল থেকে দেখাই যায় না। সেই অলীক রাজার কিংডমে ফ্রিডম শব্দটাই বছরভর অচেনা। হ্যাঁ, ওর সঙ্গে ‘অফার’ যোগ করলে অবশ্য দিন পনের আগে থেকেই টের পাওয়া যায়। কতকিছু মাথার উপর দিয়ে যায়, কিন্তু বিজঙাপন মাথার অনেক উপরে থেকেও মুখ ঢেকে দিতে পারে। সুতরাং কোন মোবাইল দোকানে ফ্রিডম অফার চলছে সে কী আর নজর এড়ায়। এদিকে পাড়ার চশমার দোকানের সামনের কাচে তিন রঙে লেখা হয়েছে, ফ্ল্যাট ২৫ % অফ সেও তো চোখ এড়ায়নি। চশমা যে কত উপকারী জিনিস কে না জানে। এই তো কী এক চশমা বাজার এনে দিয়েছে যে, সব কিছুকেই মহান ঐতিহ্যের স্ট্যাম্প লাগিয়ে উদাসীন থাকা যায়। এও এক ধরনের নির্বাসিতের আত্মকথা বটে। ধরা পড়ার ঠিক আগের মুহূর্তের বর্ণণা দিয়ে উপেন্দ্রনাথ গঙ্গোপাধ্যায় লিখেছিলেন, ‘ ক্রমে ছয়টা বাজিল, সাতটা বাজিল; আমি তখনও পর্দানশিন বিবিটির মতো পর্দার আড়ালে। ভাবিলাম, এ যাত্রায় বুঝি কর্তারা আমাকে ভুলিয়া যায়! কিন্তু সে বৃথা আশা বড় অধিকক্ষণ পোশণ করিতে হইল না। আমাদের অতিকায় ইন্সপেক্টর সাহেব জুতার শব্দে পাশের ঘর কাঁপাইতে কাঁপাইতে আসিয়া আমার ঘরের দরজা খুলিয়া ফেলিলেন। পাছে নিশ্বাসের শব্দ হয় সেই ভয়ে আমি নাক টিপিয়া ধরিলাম কিন্তু বলিহারি পুলিসের ঘ্রাণশক্তি।  সাহেব সোজা আসিয়া আমার লজ্জা নিবারণী পর্দাখানি একটানে সরাইয়া দিলেন। তারপরই চারিচক্ষের মিলন- কি স্নিগ্ধ! কি মধুর! কি প্রেমময়! ... আমার হাত বাঁধিবার হুকুম হইল। যে পুলিশ প্রহরী আমার হাত বাঁধিতে আসিল-হরি! হরি! সে যে আমাদের ‘বন্দেমাতরম’ অফিসের ভূতপূর্ব বেহারা! কতকাল সে আমাকে ‘বাবু’ বলিয়া সেলাম করিয়া চা খাওয়াইয়াছে। আজ আমার হাত বাঁধিতে আসিয়া সে বেচারীও লজ্জায় মুখ ফিরাইল।’ আমাদেরো লজ্জায় মুখ ফেরাবার সময় হয়েছে। এই বই পড়ে রবীন্দ্রনাথ মুজতবা আলীকে বলেছিলেন, ‘এরকম বই বাঙলাতে খুব কম হয়েছে।’ আর ইন্দিরা দেবী চৌধুরাণী  আশা করে লিখেছিলেন, ‘নিব্ররাসিতের আত্মকথা নব মেঘদূতের ন্যায় আমাদের অধীনতাকাতর চিত্তে স্বাধীনতা-অলকার সুসম্বাদ বহন ক’রে এনেছে।’ কিন্তু যে চশমা পরে আমরা নির্বাসিত হয়েছি, সেই নির্বাসিতের (নির্লজ্জেরো কি?)আত্মকথায় অবশ্য স্বাধীনতা নেই, ফ্রিডম আছে-তাও আবার সেই অফারে। খানিকটা আবার ডে সেলিব্রেশনের ফ্লাওয়ার অফারিঙ্গসেও বটে।
হয়েছে কি, ১৬ অগাস্ট থেকে অনেকটাই প্রসঙ্গান্তরে আনাগোনা হয়ে গেছে। তবু ১৬ অগাস্টেরও একটা অর্থ খুঁজে পাওয়া যায়। সে হল মুগ্ধ বোধদয়। এই যে ফ্রিডম নিয়ে দার্শনিকদের মধ্যে বহু মতের জলঘোলা(পোশাকি ভাষায় প্যারাডক্স) আছে। তা ফ্রিডম হোক কিংবা ইন্ডিপিডেন্স, এই ১৬ অগাস্ট সকালে আমাদের ইন্দ্রিয় জানান দেয়, ও দুটোর কোনটাই আমাদের নেই। যে সময়টা আমরা মেঘদূতের থেকে অলকার সুসংবাদের দিকে তাকিয়ে ছিলাম, ততোদিনে রাজার চেহারাটাই বদলে গেছে। আগে রাজার পেয়াদাদের মাথায় পাগড়ি থাকত, এখন গলায় ঝোলে টাইকান টানলে মাথা আসে, তবু টাই টানলে রাজার দেখা মেলে না, শুধু রাজার বাজারখানা নজরে পড়ে। আর সেই বাজার সরকার হয়ে, নাগপাশে নিজের পাকস্থলী পেঁচিয়ে নিয়ে কী চমৎকার এক রিয়ালিটি শোয়েই না পার্টিসিপেট করে চলেছে আমাদের স্বাধীনতা, ফ্রিডম, ইন্ডিপেন্ডেন্স।কাদম্বিনী মরিয়া প্রমাণ করেছিল, আর আমরা মরিয়া প্রমাণ করি, আরে না না এখনো তলানি কিছু আছে। কিন্তু বাপু হে, সে বাগানখানাও যে দিতে হবে। দিতে হয়। সব যে দিতে হবে সে তো বোধহয় আমরা জানতাম, তবু সব ঢেকেঢুকে দু খানা দেশাত্মবোধের গান চালিয়ে দিই। টিভিতে সেলেবগণ এসে বলে যান, স্বাধীনতা মানে আসলে...(বলার আগে অবশ্য দেখে নেন বুমটি কাদের)।
ওই আবার সব ঘেঁটে যেতে শুরু করেছে। এখুনি প্রশ্ন উঠবে, তাহলে কী হওয়া উচিৎ ছিল। আরে মশাই অত কী আর জানি। চোখ মেললে, কেবলই দৃশ্যের জন্ম হয়। সেটেই বরং বলি। দৃশ্যখানা দাঁড়িয়েছে এরকম,
প্রতিটা অলস বাস-মিটিং রুম
প্রতিটা বসে থাকা যাত্রী-ক্লায়েন্ট;
নিখুঁত এবং চতুর অভিনয়ে
ছিনিয়ে আনতে হবে রোজগার
মানুষ খামোখা দুখী হতে যাবে কেন?
তবু তৃতীয় বিশ্বে একমাত্র
দুখীর সাজই চলে,লোকে খায়...
কানা-খোঁড়া-কালা-ল্যাঙ্গড়া-ক্যানসার
আহা! প্রায়োরিটি কিউ ঠাসা দুখ
এতেই বাজিমাত,কনভিন্স হয়ে যায়
তিলেখচ্চর অমৃতের পুত্ররা

প্রতিট খেপ বিশ-পঁচিশ,
প্রতি খেপ শেষে আড়ালে সিগারেট;

বর্ষা আসুক বা বসন্ত
খোলা এইট-বি স্ট্যান্ডে
প্রতিদিন অফিস করছে আনন্দে

চৌষট্টি বছরের স্বাধীন
মানুষ,
কর্পোরেট!


ও হ্যাঁ আর একখানা ১৬ অগাস্টে লেখাটার বয়স বেড়েছে, বাকি সব এক, একই। তবু এসব নিয়ে সময় কাটানোর সময়ই বা কোথায়? ১৬ অগাস্ট ‘গর্মেন্ট’ ছুটি দেয় নাকি?             

No comments: