COME TO www.dolchhut.org

তা ধিন স্‌শা (লা) : বারীন ঘোষাল


    ১৫-ই আগস্ট না থাকলে ১৬-ই আগস্টও হয় না। শৈশবে যত এনজয় করতাম ১৫-ই আগস্ট, বালকবেলা পেরিয়ে ধীরে ধীরে তা উবে গেল। প্রথমবার তো ১৯৪৭ সালে বাবা কাঁধে চাপিয়ে পাড়ার মাঠে নিয়ে গিয়েছিল ভারতবর্ষে সর্বপ্রথম-বারের সার্বজনীন পতাকা উত্তোলনের হাঙ্গামা দেখাতে। স্বাধীনতা জাহির হয়েছিল ধুমধাম করে। উত্তেজনা দেখেছিলাম, কারণ বুঝিনি। মনে আছে থিকথিকে ভিড়, ব্যান্ড-বাঁশি, গান, হুল্লোড়, শ্লোগান, আমার হাতে এক প্যাকেট লজেন্স গুঁজে দিলো কে যেন। সেই প্রথম দেখেছিলাম কিভাবে পতাকা ওড়াতে হয়, পতাকা কেমন দেখতে, সবাই কিরকমভাবে স্যালুট করে। অত ভিড়ে একলা যাওয়া যাবে না বলেই বাবার কাঁধে। ওই দিনটা তো আর কোনদিন ফিরে আসবে না। তাই বাবা। আমি কৃতজ্ঞ। পরদিন ১৬ তারিখ, মাঠ ফাঁকা, আমি গেছি দেখতে, একলা, দু-চারটে বাচ্চা, সবাই খুঁজছে ফাটা বেলুন, রঙীন কাগজ, এক-আধটা লজেন্স, ফুলের মালা, হাতে পকেটে। আমিও। তালে তালে পা, ব্যান্ড বাজছে যেন, আমিও কালকের জনগণ থেকে আজকের জনগণে গুনগুন করি। দু-পকেট ভরে বাড়ি ফিরলে সেই বাবাই দুম দুম দুম। কান্না। পকেটের মাল টেনে ছিঁড়ে ছুঁড়ে ফেলে দেওয়া হলআমার প্রথম ১৬-ই আগস্ট।
    কিশোর বয়স থেকে পাড়ার ক্লাবে, স্কুলে মার্চ পাস্ট, ব্যান্ড, উর্দ্ধ গগনে মাদল বাজিয়ে প্রভাতফেরী, পতাকা ঘিরে জনগণ, মিস্টি, চকলেট, মহাত্মা গান্ধী, নেতাজী নেহেরু মিলে উদ্দীপনা ছিল। মনের অবস্থা ছিল তা ধিন স্‌শা (লা) -- অক্ষর হেরফের করার পাল্টা স্বাধীনতা আর ষোল তারিখে সব পরিষ্কার করে গুছিয়ে রেখে দিনভরের ছুটি, খেলা ধুলো, আড্ডা, খুচরো প্রেম। এমনকি বাড়িতেও নেই বিধি নিষেধ। বাবা পর্যন্ত তাকায় না। এভাবে গোল্লায়।
    খবরের কাগজে রাজনীতির কথা না, খেলাধুলা, কার্টুন দেখতাম, রেডিওতে গান, বুড়োদের কথায় কান দিতাম না। জানা ছিল না দেশটা কোন দিকে যাচ্ছে। হঠাৎ একদিন দেখি অনেক লোক মিছিল করে যাচ্ছে, সামনের দিকে হাতে কিরকম যেন একটা ফ্ল্যাগ, জাতীয় পতাকা ছাড়া মিছিল সেই প্রথম দেখলাম, আর লোকগুলো হাত মুঠো করে মাথার ওপরে তুলে চেঁচিয়ে বলছে – ‘ ইয়ে আজাদী ঝুঠা হ্যায় ’ --- কেন কে জানে। সেই প্রথম কানে বিষ ঢুকলো, নেগেটিভ থিংকিং, বয়স শুরু হল আমার। ১৬ তারিখের আজাদী হারিয়ে গেল। এরপর দীর্ঘকাল এই নিয়ে আর ভাবিনি। স্বাধীনতার নেগেটিভ ভাবনা নাটশেল হয়ে রইল আমার মনে। যেন আমি পৃথিবীর মধ্যে শ্রেষ্ঠ ভাবনাটা পেয়ে গেছি। যৌবনে অন্যান্য আকর্ষণ ছাপিয়ে গেল। ১৬-ই আগস্টে বৃষ্টি পড়ল হরদম। আমার ফোকাস ঘুরে গেছিল।
    আবার কি করে আমার জীবনে ১৬-ই আগস্ট ফিরে এল সেই কথায় আসি। তখন আমি বিয়ের উপযুক্ত। আমার কোন প্রেম কিছুতেই আর বিয়ে পর্যন্ত গড়ায় না। অগত্যা বাবা মা সম্বন্ধ দেখা শুরু করল। বিয়েও হয়ে গেল এক ১৪-ই আগস্টতুমুল। চেতনা টনটন। সারা দিনের কর্মকান্ড খুব এনজয় করলাম। কল্পনার অপ্রস্তুত অবস্থা আর অন্দরমহলের হাল্লাবোল। পরদিন ১৫-ই আগস্ট, কালরাত্রি, ম্যাড়মেড়ে, কাটতেই চায় না, তবু আশায় আশায়। ১৬ তারিখে শুভরাত্রির কথা ভেবে ভেবে সেই প্রথমবার, তারিখটা আমার মনে পার্মানেন্ট দাগ দিয়ে রাখলোসেই আগামীকালটা হতেই ফুরফুর করছে শরীর মন, দিনের সবকিছু, সবাইকে, সব কথা ভাল লাগছে। অবশেষে, যদিও আমার প্রথম নয়, কিন্তু কল্পনার সাথে সেই প্রথম, রাত্রে সর্বসমক্ষে, সবার অনুমতিতে, বন্ধ ঘরে সঙ্গম সঙ্গম সারারাত। ১৬ তারিখ আমার জীবনে অক্ষয় হয়ে রইল। মৃগাঙ্ককে ধন্যযোগ, আমাকে এই সুবাদে স্মরণ করিয়ে দিতে সেই সুখস্মৃতি। কাকতালীয় ভাবে ১৬ আগস্ট আমার কাছে শ্রেষ্ঠ তারিখ অবশ্যই। আমি কি ভুলিতে পারি ? কল্পনায় আমি পূর্ণ স্বাধীনতা পেয়ে তা ধিন স্‌শা (লা) বলে উঠলাম।

No comments: