বাদামী রঙের নখটার কোণ ঘেঁষে ডানদিকে নেমে যেখানে বুড়ো আঙ্গুলের ডিস্টাল ফ্যালাংক্সটা ভাঁজ খেয়েছে ওখানেই চুলকাচ্ছিল। চুলকানিটা যে এই প্রথম নয়, কথাটাকে আঙ্গুলের গায়ে সাদা গুঁড়ো গুঁড়ো লেগে থাকা চামড়াগুলো অকাট্যভাবে প্রমাণ করে। ব্যাপারটার অবশ্য আরেক রকম সিচ্যুয়েশনাল এভিডেন্স ছিল। লোকটার সারা শরীর বার্ন্ট অ্যাম্বর রঙের ময়লার আস্তরনে ঢাকা থাকলেও শুধু বুড়ো আঙ্গুলের ভাঁজটাই ছিল পরিষ্কার, চামড়ার আসল রংটা অল্প হলেও দেখা যাচ্ছিল।
এটা একটা অন্যরকম পাওনা। পাগলদের গাঁয়ের
চামড়ার রঙ চট করে জানার সুযোগ আসে না। আর এলেও সেই সুযোগ সবাই সদব্যাবহার করতে
পারে না। দিনটাকে ঠিক এই বিশেষত্ব দিতেই একটা কাক মাথার উপর থেকে পাগলের হাতের
দিকে নজর রাখছিল। এমন নয় যে এ জিনিস আগে হয়নি বা পাগল আগে কাক দেখেনি বা কাক আগে
পাগল দেখেনি। তবুও এক
অনন্যসাধারণ ঘটনার সাক্ষী একটি দিন হিসাবেই এটা ইতিহাসের পাতায় স্থান করে নেবে।
তবে এটাই ১৬ আগস্টে হওয়া অসাধারণ ঘটনাগুলির মধ্যে শেষতম ছিল না। আরও ছিল।
বাদামী চুড়িদারের সাথে হলুদ
পাজামা মানায় কিনা তা একটা শাশ্বত প্রশ্ন। ঝুমার আগে কোটি কোটি মেয়ের মনে এই প্রশ্ন
জেগেছে এবং কেউ আজ অব্দি সঠিক বা গ্রহণযোগ্য কোন উত্তরই বার করতে পারেনি। আজ
বেরনোর তোড়জোড় বছরের অন্যান্য দিনগুলোর মতই ছিল। বরং বলা ভাল আগের দিনের মত ছিল
না। কিন্তু দৈনন্দিনতার দৈন্য এই প্রশ্নের গাম্ভীর্য্য একটুও ম্লান করে দিতে
পারেনি। ঝুমা যে স্কুলে পড়ায় সেখানে ছাত্র, শিক্ষক বা শিক্ষিকা কেউই ঝুমাকে খুব
সুন্দরী বলে ভুল করে না। বরং সবারমধ্যেওর অসৌন্দর্য্য নিয়ে একটা ঐক্যমত্য আছে। তবে
ঝুমা এটা খুব নিঃসন্দেহভাবে জানে যে ওর জামাকাপড়ের ম্যাচিং ভুল হলে প্রত্যেকে এককভাবে
এবং সবাই একত্রে ও নিজেদের মধ্যে নানারকম কম্বিনেশন বানিয়ে হাসবে।তাই অনেকদিনের
ইচ্ছে সত্ত্বেও আজ অব্দি লেমন ইয়েলো রঙের ওড়না গায়ে তোলা হয়নি ঝুমার।
অভিজ্ঞতার আঁচে পোড়খাওয়া মেয়ে
অত্যন্ত পরিপাটি করে চুল আঁচড়ায়।এরপরে
ঝুমা সন্তর্পণে বাড়ি থেকে বেরোয়। কিন্তু মহেন্দ্র দত্ত অ্যান্ড সন্সের ডার্ক নীল ছাতাটা
খুলে আকাশ ঢেকে ফেলার আগেই একটা কাক নজর করে নেয় ঝুমা ২১টা চুল দিয়ে বানানো একটা
মিডিয়ামসাইজের গোছাকে হেয়ার লাইনের ঠিক ৩০ ডিগ্রি দক্ষিণে নামিয়ে কপালের পাশে রেখে
দিয়েছে। এবং সেটায় কোথা থেকে লেমন ইয়েলো রঙের একটা তেঁতুল পাতা উড়ে এসে আটকে গেছে।অথচ
কাকটার মানুষের সৌন্দর্য্য নিয়ে সেরকম পড়াশুনা ছিল না।
কাজল ঝুমার পাশের বাড়ী থাকে। ওকে
অবশ্য কোনদিনই ঝুমাপাশের বাড়ির মেয়ে বলে মনে করে না। এর তিনটে স্পষ্ট কারণ আছে।
এক, সামাজিক কারণ; কাজলের জন্ম পাশের বাড়ী হয়নি। ও শহরের অন্য কোন বাড়ি থেকে বিয়ে
নামক একটা প্রসেসের মাধ্যমে এই বাড়িতে এসে উঠেছে। দুই, অর্থনৈতিক কারণ;পাশের বাড়ির
ছাতটা সিমেন্ট দিয়ে তৈরি নয় এবং কাজল লোকের বাড়ি ঘুরে ঘুরে বাসন মাজে। তিন, সাধারণ
কারণ; বহু ব্যবহারের মধ্য দিয়ে ওর একটা ছেলে হয়েছে, তাই কাজলকে মনে হয় না আর কেউ
মেয়ে বলে মনে করে।
এতগুলো কারণের বোঝা থাকা সত্ত্বেও
কাজল বাড়ি থেকে বেরিয়ে সাইকেলে ওঠার আগে শাড়ির আঁচল দিয়ে পেটের পাশটা ঢাকার একটা
প্রচেষ্টা চালায়। অনেকেই এটাকে মুদ্রাদোষ বলে হেয় করে। এই অনেকের মধ্যে অনেকে আবার
এধরণের প্রচেষ্টাকে মন থেকে অসমর্থন জানায়। দত্তবাবু, মানে যাদের বাড়ী কাজল একটু
বাদে কাজ করতে যাবে, এদের মধ্যে একজন। তবে কেউই এটাকে অস্বাভাবিক ঘটনার মধ্যে
ফেলেনা। যদিও ঝুমার উপর নজরদারি করা কাকটার মনে হচ্ছিল কাজল আজ কিছুটা হলেও বেশি
সময় ধরে চেষ্টা করছে।
এই ব্যাপারের কারণ সম্পর্কে
কাজলের ধারণা ছিল সেসব ও একাই জানে। তবে ধারণাটা সম্পূর্ণ ভুল ছিল। দত্তবাবু মাঝবয়সী
লোক, ৪৫ বছর বয়স। পুরো নাম সুধীররঞ্জন
দত্ত। দত্তবাবু গতরাতে বউয়ের সাথে প্রায় জবরদস্তি করে একবাটি গরম মোষের দুধ
খেয়েছেন। মোষের বা অন্য কোন পশুর দুধই যে খেতে হবে এরকম কোন প্রতিজ্ঞা দত্তবাবুর
মধ্যে ছিল না। তবে দৈহিক শক্তি বাড়ানোর জন্য অন্য খাবারের কথা ওনার মাথায় আসেনি।
মাঝবয়সী মানুষদের সাধারণতঃ যে
কারণে দৈহিক শক্তির ব্যাপারটা মাথায় আসে সেটা দত্তবাবুর জীবন থেকে গত তিনমাস
অনুপস্থিত। যদিও দত্তবাবু এর জন্য স্ত্রীর কলসির মত মোটা হয়ে যাওয়াকেই দায়ী করেছেন
বেশী, তবুও নিজেকে নিয়ে ওনার সন্দেহ ছিল। এই কারণটা ওনাকে কাজলের পেটের দিকে
তাকিয়ে থাকতে বাধ্য করে কি না সেটা গবেষণার বিষয়। তবে এ নিয়ে কারও সন্দেহ ছিল নাযে
প্রায় ৭০০ বর্গ সেন্টিমিটার মাপের ওই উজ্জ্বল বাদামী হলদে চামড়ার অংশটুকু দেখার
জন্যই যে উনি দেরি করে অফিসে বেরোন।সরকারি
ইলেক্ট্রিসিটি অফিসে কাজ করার জন্য এবং অফিস বাড়ির কাছাকাছি হওয়ার জন্য এই দেরী
পৃথিবীর কোনপ্রান্তে কোন প্রশ্নের উৎপত্তি ঘটায় না। তবে গতকাল ১৫ই আগস্টের ছুটি
থাকায় আজ আর দত্তবাবুর কাজলের জন্য দেরী করা হলনা। এতে দত্তবাবুর মনটা অল্প খারাপ
হলেও ওঁদের বাড়ির সামনে বসে থাকা কাকটা শুধুই অবাক হল।
বছরের এই সময়টার একটা গুণ আছে। সব
ছেলে কুকুর মিলে মেয়ে কুকুরদের পেছন শুঁকতে থাকে। জৈবিক পারফিউমের এ এক অসাধারণ বিজ্ঞাপন।
বহুজাতিক কোম্পানিরা এই ভাবনা কপি করে অনেক অ্যাড বানিয়েছে। যেমন, একটা ছেলেমানুষের
খোলা বগল, বুক ও নাভির গন্ধে হাজার হাজার মেয়েমানুষ দৌড়ে আসছে কিংবা ফুলেরা পারফিউমের
ঝাঁজে তাড়াতাড়ি ফুটে যাচ্ছে ইত্যাদি। কিন্তু
একটাও এটার মত সফল হয়নি।
লালি অবশ্য সরাসরি ছেলে
কুকুরদেরএই মাতামাতিতে জড়িয়ে পড়েনি। ও দত্তবাবুদের সেপ্টিক ট্যাঙ্কের উপরে উঠে
দেখছিল। সামনে মারামারি করছিল৬টা কুকুর। এদের
মধ্যে ৪ টে কুকুর এক টিম, আর বাকী দুটো সোলো প্লেয়ার। লড়াই প্রায় সমানে সমানে
হচ্ছিল, যেহেতু একা কুকুর দুটো সাইজে বড় ছিল। এটা জীবজগতে প্রজাতি নির্বিশেষে
সত্য; বড়সড় শক্তিশালী পুরুষ ছাড়া কেউ অন্য পাড়ায় র্যালা নিতে যায় না। কিন্তু লালি
এই নিয়ে ভীষণ চিন্তিত ছিল কিনা তা বোঝা গেল না, বিশেষত দত্তবাবুর বউ স্বামীর
খাওয়ার এঁটোকাঁটা নিয়ে বেরোতেই যে অবিশ্বাস্য দ্রুততায় ও ওদিকে চলে গেল। কাকেদের
কাছে ঠিক এই জায়গাতেই লালি ঝুমার থেকে আলাদা হয়ে যায়।
এই ঘটনাপ্রবাহচলেআসছেঅনন্তকাল
ধরে। একদম এই কারণেই ঝুমাদের সিমেন্টের ও কাজলদেরটালির ছাতওয়ালা বাড়ির সামনের
রাস্তাটা দত্তবাবুদের গলি পেরিয়ে অনেকটা এসে যে বড় মোড়ে পড়েছে সেখানে দাঁড়িয়ে থাকা
পাগলটা কারোর দিকে তাকাচ্ছে না। ওর সামনে ডাস্টবিন। পেছনে অজস্র গাড়ীঘোড়ায় বোঝাই
একটা নেতাজীর স্ট্যাচুওয়ালা তিনমাথার মোড়। স্ট্যাচুটার মাথার থেকে আলোকরশ্মির মত
দড়ি বেরিয়ে গেছে নানা দিকে। এই দড়িগুলোয় গতকাল ছোট ছোট সারি সারি কাগজের স্বাধীনতা
ঝুলছিল। আজ বেশীরভাগ গুলোই ছিঁড়ে গিয়ে তলায় এদিকে ওদিকে ছিটিয়ে রয়েছে।
পাগল ওরকমই একটা তিনরঙ্গা কাগজ
বাঁহাত দিয়ে তুলে নিল আলগোছে। এই কাজে সেভাবে মনোযোগ দিতে না পারার কারণ ছিল ওর চুলকানিওয়ালা
সামান্য পরিষ্কার ডানহাতে ধরা সদ্য কুড়ানো একটা লুচি ও একটি আলু; আর পুরো
ব্যাপারটার উদ্দেশ্য ছিল কাগজে মুড়িয়ে দুদিনের প্রাচীন লুচি ও আলুর স্বাস্থ্যকর
সংরক্ষণ। হয়ত সমসাময়িকতার নিরিখে এটা বেআইনী ছিল, তাই দেখেই কাকটা মাত্র একবার কা
বলে উড়ে চলে গেল। ঘটনার আকস্মিকতা নাড়া দিল পাগলের মনে। একঝলক উপরের দিকে দেখে
পাগল স্বগতোক্তি করল, “নাঃ ঈশ্বরের আজও সময় হল না মাটিতে নামার।“
ঠিক সেই মুহুর্তে বহু
উপরে ভেসে থাকা একটা চিল নীচের দিকে তাকিয়ে দেখল, স্বাধীনতায় মোড়া খাবার হাতে নিয়ে
দাঁড়িয়ে থাকা এক স্বাধীন মানুষকে অসংখ্য পরাধীন যানবাহন, অজস্র পরাধীন মানুষ ও
কিছু পরাধীন কুকুর তিনদিক থেকে ক্রমশঃ ধিরে ধরছে।
No comments:
Post a Comment