COME TO www.dolchhut.org

১৬ আগস্টঃ ফেল করা স্বদেশঃ ইন্দ্রনীল ঘোষ

তুমি এবারও লাইটগুলো কিনলে না
সামনের বছর
বলতে বলতে মা পাশ ফিরে শোয়অর্থাৎ ঘুমোতে দে, কথা বাড়াস না
স্বদেশ দরজা ভেজিয়ে বারান্দায় এসে দাঁড়ায়সামনের বছর সে থোড়িই থাকবে! এবারই রেজাল্ট বেরোনোর পর কোনও একটা বন্দোবস্ত করে হুশ
ইশ! লাইটগুলো সব খুলে নিয়ে যাচ্ছেমা যে কি-না! প্রত্যেক বছর জন্মদিনের বেলা একই জিনিষকি চূড়ান্ত হিউমিলিয়েটিং! আগের দিন স্বাধীনতা দিবসপাড়ায় বেশ বড়সড় ঘটা, সকালে ঘুম ভাঙতেই বক্সে দেশের গান... সাজো সাজো রববাড়ির ঠিক সামনেই সবকিছুমাঠে মাচা হবে, লাইট লাগবে, বেদি করে বাঁশ পুঁতে পতাকা টাঙানো হবে; তারপর সকালবেলা মিষ্টি টফি, সন্ধেবেলা মাচায় কালচারাল প্রোগ্রাম, পাড়ার ছেলেমেয়েদের নাচ গান আবৃত্তি, সমিতির লোকদের বক্তৃতা, কত কি! সমস্ত দিন ধরে যেন বাড়িটা ঘিরে উৎসব, ছুটি, হুজ্জতিআর ঠিক, ঠিক যেই রাত এগারোটা বাজলো, তার জন্মদিন শুরু হবো হবো, ওমনি...
ঘনাদা, আরে লাইটগুলো খোলো খোলো, দেরি করো না
মাচার পিছন দিকে যা তুই, বাঁশগুলো হাল্কা কর
সব লোকজন ক্লান্ত হয়ে অনুষ্ঠান শেষ করে বাড়ি পালাবে, মাচার লোকেরা এসে বাঁশ খুলবে, লাইটের লোকেরা লাইট নিয়ে টানাটানি শুরু করে দেবেরাত থেকেই কেমন একটা সব ভেঙে যাওয়ার, শেষ হয়ে যাওয়ার পেট-টনটন আরম্ভ হয়পরদিন ঘুম ভাঙলে আরও মনখারাপ, কীরম এক ম্যাড়ম্যাড়ে সাদামাটা দিন, রাস্তাঘাট মানুষজন সবকিছু ধবধবে, স্কুল অফিস খুলে গেছে, সবাই লেগে পড়েছে প্রাত্যহিকেতার জন্মদিনের জন্য কারও কোনও পরোয়াই নেই! মাকে কবে থেকে বলছে, ঘরের বাইরে দেওয়ার জন্য কিছু লাইট কিনতেওই পুজোর সময় লোকজন যেরম টাঙায় না, সেইরকম! কত আর দাম! তাই নিয়েই প্রত্যেক বছর মা সামনের বছরে পাস দিয়ে যায়অন্তত আলো দিয়ে বাড়িটা একটু সাজালে তা না আগের দিন আলো ঝলমল করছে চারপাশে, আর তার জন্মদিনের দিনই যত রাজ্যের অন্ধকার
স্কুল থেকে ফিরলে, একটা থালায় ভাত, বাটিতে তরকারি, মাছ, পায়েস সাজিয়ে দেবে মাএকটা প্রদীপ জ্বালবে, শাঁখ বাজাবে খাওয়ার সময়জন্মদিন বলতে ওটুকুইওই একরত্তি আয়োজন আরও যন্ত্রণারসে যেন চোখে আঙুল দিয়ে দ্যাখায়, না পারাগুলোযেন উৎসবের, উদযাপনের সাধ আছে তাদের কিন্তু সামর্থ্য নেইযেন এই ভাতের থালায় এক অনধিকার খুশি তারা ভাগ করে নিতে চাইছে লুকিয়ে
তবু মার কথা ভেবে কিছু বলে না স্বদেশফ্যাক্টরি বন্ধ হয়ে বাবার কাজ যাওয়ার পর থেকেই মাকে খাটতে হয়প্রথমে ঘরে বসে টিউশানিতারপর বাবা মারা গেল... ২০০৭... উঁহু... স্বদেশ তখন ক্লাস সিক্স... মানে ২০০৮... তারপরই মাকে চাকরি নিতে হয় একটা... বেসরকারি অফিসে
বাবার ওপর হেব্বি রাগ স্বদেশেরএমন কাণ্ডজ্ঞানহীন মানুষ, সে আর দ্যাখেনিএকটা সংসার করলো, সামলাতে পারলো না... আবার বিয়ের পর দীঘা গিয়ে জড়িয়ে ছবিও তোলা হয়েছিলোঅথচ দ্যাখো, এখন কি অবস্থা! স্বদেশের সমস্ত অভিযোগ গিয়ে তার বাবার ওপর পরেবেচারা মৃত মানুষ... উঠে এসে আত্মপক্ষও নিতে পারবে নাস্বদেশ নিজেই কাল্পনিক কথোপকথন খাড়া করেঝগড়ার কতগুলো সম্ভাব্য প্ল্যানচেট...
তুমি এত ইরেসপন্সিবল! দুমদাম জন্ম দিয়ে দিলেতারপর যে ছেলের জন্য একটা দায়িত্ব থাকে, সেটা মাথায় নেই?
কী করবো? মরে যে যাবো, তা কি আগে জানতাম? না আমার হাত ছিলো?
উঁহু উঁহু... এরকম নয়
কী চূড়ান্ত দায়িত্বজ্ঞানহীন তুমি! ছিঃ...
কেন আমি আবার কী করলাম?
না নাধুরমারা যাওয়ার পর ছেলের সাথে কথা বলতে এলে বাবার নিশ্চয়ই একটা গিলটি ফিল হবে, মুখটা শুকনো, অপরাধবোধস্বদেশ রি-কন্সট্রাকট করে ঝগড়াটা
কী চূড়ান্ত দায়িত্বজ্ঞানহীন তুমি! ছিঃ...
আমি সত্যিই জানতাম না বাবাভেবেছিলাম অনেককিছু করবো তোদের জন্যহঠাৎ মরে গেলাম
তুমি এটাও জানতে না, যে পনেরোই অগাস্ট স্বাধীনতা দিবস, আর আমি ষোলো তারিখ জন্মেছি?
তা কেন জানবো না রে? (স্নেহ প্রশ্রয় মিশে বাবার গলা কাঁপে)
তবে আমার নাম স্বদেশ দিলে কেন?
মাথায় এলো দিয়ে দিলামকাছাকাছিই তো দুটো দিনক্ষতি কী? কেন রে, কিছু ভুল হয়েছে?
কী দায়িত্বজ্ঞানহীন! কী দায়িত্বজ্ঞানহীন! আবার জিগ্যেস করে কিছু ভুল হয়েছে’?

এই নামের জন্যই যত সমস্যাবাবার একমুহূর্তের না ভেবেচিন্তে করা কাজ, তার পুরো লাইফটাই হেল করে দিলোস্কুল থেকে পাড়া দিনরাত হ্যাটা হতে হচ্ছেপ্রথম শুরু হয়েছিলো ক্লাস এইটেযেদিন সুবোধবাবু তাদের ইতিহাস পড়াতে এলেন
নাম কী তোর?
স্বদেশ পাল
বাব্বা! স্বদেশ? পনেরোই অগাস্ট জন্ম না-কি?
নাষোলোইঅগাস্ট
হে হে হো হো... ইতিহাস স্যার তরঙ্গে হাসতে শুরু করেনতাঁর হাসি দেখে ক্লাসের বাকিরাওকেন এই হাসি বুঝতে পারে না স্বদেশএদিক ওদিক তাকায়নিজেও অল্প অল্প হাসার চেষ্টা করেযেন তার জন্মদিনটা এক বিশাল কমেডিকিম্বা তার জন্মটাআর তা সব্বাই জেনে ফেলেছেসে-ও সেই জানার দলে মানিয়ে নিতে, অল্প অল্প হাসে
কিছুক্ষণ পর হাসি থামলে, স্যার বলেন,
তুই তো ফেল করা স্বদেশ রে! পনেরোর জায়গায় ষোলোতে জন্মেছিস! এক দিন ফেল

সেই শুরুএরপর সব জায়গায়ওই তো ফেল করা স্বদেশ যাচ্ছেদ্যাখ দ্যাখ ফেলু স্বদেশ দাঁড়িয়েআরে আমাদের ফেল করা স্বদেশ এবার ফিফথ হয়েছে
কোনোদিনই পড়াশুনোয় সে খারাপ ছিল নাবা এমন কিছু, যাতে তাকে বাকিদের থেকে ছোট করা যায়শুধু বাবার ওই একটা ভুল তাকে কীরম সবার মধ্যে আলাদা করে দিলোযেন ফেল করা স্বদেশহয়েও, সে যে আর পাঁচজনের মতো জীবন কাটাচ্ছে এটাই এক চূড়ান্ত অন্যায়মুখ লুকিয়ে থাকতে হতো সমস্ত জায়গায়জলতেষ্টার মতো একটা sorry, তোতলাতে তোতলাতে শুকিয়ে যেতো গলায়সব সময় পালিয়ে বেড়াতোসুড়ঙ্গ কাটতো চারপাশেআনন্দে উচ্ছ্বাসে ভয় করতো, এই কেউ এক্ষুনি এসে চেঁচিয়ে দেবে ওই তো আমাদের ফেল করা স্বদেশওর জন্মদিনের আগের দিন আলো জ্বলে ওর বাড়ির সামনে, জন্মদিন অন্ধকারআগের দিন টফি মিষ্টি বিলোনো হয়, জন্মদিন ভোকাট্টাওই তো
মা-এর সাথে রাস্তায় বের হতে ভয়আত্মীয়-স্বজন এলে তাদের স্টেশন পৌঁছে দিতে ভয়যদি কেউ ডেকে দ্যায়... সবার সামনে!
রিমলির কথাগুলো এখনও মনে আছে স্বদেশের

তোর জন্য আমায় শুনতে হয়ফেলু স্বদেশের গার্লফ্রেন্ডলে ক্ষ্যাপায়
পাস দেইগনোর করলেই মিটে যায়
তবু তুই ওদের কিছু বলবি না?
কী বলবো? ওরা অত জন! মারবো?
বিন্দুমাত্র গাটস নেই তোর! কোনোদিন আর আমার সাথে সম্পর্ক রাখবি না
রিমলি! বোঝ
শুধু আমার সাথে নয়কারো সাথেই কখনও সম্পর্ক তৈরি করিস নাতুই সত্যিই ফেল করাতোর সাথে যারা জড়িয়ে পড়বে, তাদেরও সেই ইনসাল্টের ভাগীদার হতে হবে, আর তুই বসে বসে আঙুল চুষবি

এতসবের পর বাবা জিগ্যেস করছে, ‘কিছু ভুল হয়েছে’? বারান্দার এক কোণে বসে পড়ে স্বদেশবাবা তার পাশেমুখে ছবছরের ঝাপসা দূরত্ব

এমনটা হবে আমি জানতাম নাসত্যিতুই হয়তো ঠিকই বলেছিসনা ভেবে চিন্তেই নামটা দেওয়াআসলে আমার বাবা আমার নাম রেখেছিলো বিপ্লব... বাবা ছিলো ফ্রিডম ফাইটার... তার যখন আঠেরো, ভারত স্বাধীন হয়... স্বাধীন ভারতে জন্মানো স্বত্বেও আমার নাম কেন বিপ্লব দিলো আমি কোনোদিনও বুঝিনি... কে জানে... হয়তো স্বাধীনতা নয় বরং বিপ্লবটাই বাবার কাছে একটা পরিচয় ছিলোতো আমিও ভাবলাম, বিপ্লবের ছেলে স্বদেশ... মানাবে ভালো... তাছাড়া দিনটাও যখন স্বাধীনতার পরপরইনাহ... বোকার মতো নামের এরম ব্রিজ বানাতে গিয়ে... এত বড় একটা ভুল করে ফেলেছি

বাবাকে আর কিছু বলে না স্বদেশযাক গেযা হবার তা তো হয়েই গেছেযথেষ্ট গিলটি ফিল করানো গেছে... ওভারতাছাড়া কতদিন আর! সামনের বছর কোনও একটা স্কলারশিপ যে করেই হোক জোগাড় করে হুশলোকজন হয়তো শেষবারের মতো বলবে ফেল করা স্বদেশ আমেরিকা পালালো

মা এবারও লাইট কিনে দ্যায়নি, না রে?
তুমি কী করে জানলে?
বাবা কোনও উত্তর দ্যায় নাবুকপকেট থেকে একটা প্যাকেট বার করে ছোটহাতে দ্যায়
এটা কী?
রেডিয়াম স্টারশোয়ার ঘরে সিলিং-এ লাগিয়ে দিস
সেই অন্ধকার ঘরের মধ্যে যে তারাগুলো জ্বলে, সেইগুলো?
কখনও ঘুম ভাঙলে মনে হবে, খোলা একটা মাঠে শুয়ে আছিস, আকাশের নিচে। 
কোত্থেকে আনলে?

বাবা হাসেঝাপসা দূরত্বের হাসি যেরকম হয়

নিচে লোকগুলো পুরো স্টেজটাই খুলে ফেলেছেলাইটগুলোওগোছানো হচ্ছে সবগোটা মাঠের মধ্যে একটাই বাঁশ শুধু খাড়া, সেদিকে কারও নজর নেইদিনের বেলা পতাকা টাঙানো হয়েছিলো ওটাতেইএখন শুকনো ফুল আর ইঁটের মধ্যে খালি বাঁশটা দাঁড়িয়ে রয়েছে
মিনিট কয়েক সেদিকে তাকিয়ে থাকতেই স্বদেশের নজরে পড়ে আরে একটা বাঁদর না! তাইতোএত রাতে বাঁশ বেয়ে ওপরে ওঠা খেলছেপ্রতিবার এক লাফ মেরে কিছুটা ওঠে, তারপর গড়িয়ে খানিকটা নেমে আসেহে হে... সেই ছোটবেলার অঙ্কটার মতোকী লম্বা প্রসেস!
অঙ্কের বাঁদরকে সামনাসামনি দেখতে পেয়ে দারুণ মজা হয় স্বদেশেরমনে মনে আওড়াতে থাকে একটি বানর একটি তৈলাক্ত বাঁশ বেয়ে ১ম মিনিটে ৫ ফুট উপরে ওঠে আর তার পরের মিনিটে ৪ ফুট নিচে নেমে যায়।...
আচ্ছা বাবা, সময়ের এই অঙ্কটাতে, বাঁদর খালি দুটো কাজই করতো উঠতো আর নামতো... তাহলে জিরোতো কোন সময়?



No comments: