– তুমি এবারও লাইটগুলো কিনলে না।
– সামনের বছর।
বলতে বলতে মা পাশ ফিরে
শোয়। অর্থাৎ ঘুমোতে দে, কথা বাড়াস না।
স্বদেশ দরজা ভেজিয়ে
বারান্দায় এসে দাঁড়ায়। সামনের বছর সে থোড়িই
থাকবে! এ’ বারই রেজাল্ট বেরোনোর পর কোনও একটা বন্দোবস্ত ক’রে হুশ।
ইশ! লাইটগুলো সব খুলে
নিয়ে যাচ্ছে। মা যে কি-না! প্রত্যেক বছর জন্মদিনের বেলা
একই জিনিষ। কি চূড়ান্ত হিউমিলিয়েটিং! আগের দিন স্বাধীনতা
দিবস। পাড়ায় বেশ বড়সড় ঘটা, সকালে ঘুম ভাঙতেই বক্সে
দেশের গান... সাজো সাজো রব। বাড়ির ঠিক সামনেই সবকিছু। মাঠে মাচা হবে, লাইট লাগবে, বেদি ক’রে বাঁশ পুঁতে পতাকা
টাঙানো হবে;
তারপর সকালবেলা মিষ্টি টফি, সন্ধেবেলা মাচায় কালচারাল প্রোগ্রাম, পাড়ার ছেলেমেয়েদের
নাচ গান আবৃত্তি,
সমিতির লোকদের বক্তৃতা, কত কি! সমস্ত দিন ধ’রে যেন বাড়িটা ঘিরে উৎসব, ছুটি, হুজ্জতি। আর ঠিক, ঠিক যেই রাত এগারোটা বাজলো, তার জন্মদিন শুরু হবো
হবো, ওমনি...
– ঘনাদা, আরে লাইটগুলো খোলো
খোলো, দেরি করো না।
– মাচার পিছন দিকে যা তুই, বাঁশগুলো হাল্কা কর।
সব লোকজন ক্লান্ত হয়ে
অনুষ্ঠান শেষ ক’রে বাড়ি পালাবে, মাচার লোকেরা এসে বাঁশ খুলবে, লাইটের লোকেরা লাইট
নিয়ে টানাটানি শুরু ক’রে দেবে। রাত থেকেই কেমন একটা সব ভেঙে যাওয়ার, শেষ হয়ে যাওয়ার পেট-টনটন আরম্ভ হয়। পরদিন ঘুম ভাঙলে আরও মনখারাপ, কীর’ম এক ম্যাড়ম্যাড়ে সাদামাটা
দিন, রাস্তাঘাট মানুষজন সবকিছু ধবধবে, স্কুল অফিস খুলে গেছে, সবাই লেগে পড়েছে প্রাত্যহিকে। তার জন্মদিনের জন্য কারও কোনও পরোয়াই নেই! মাকে কবে থেকে বলছে, ঘরের বাইরে দেওয়ার
জন্য কিছু লাইট কিনতে। ওই পুজোর সময় লোকজন
যের’ম টাঙায় না,
সেইরকম! কত আর দাম! তাই নিয়েই প্রত্যেক বছর মা সামনের বছরে পাস দিয়ে যায়। অন্তত আলো দিয়ে বাড়িটা একটু সাজালে – । তা না আগের দিন আলো ঝলমল করছে চারপাশে, আর তার জন্মদিনের দিনই
যত রাজ্যের অন্ধকার।
স্কুল থেকে ফিরলে, একটা থালায় ভাত, বাটিতে তরকারি, মাছ, পায়েস সাজিয়ে দেবে
মা। একটা প্রদীপ জ্বালবে, শাঁখ বাজাবে খাওয়ার
সময়। জন্মদিন বলতে ওটুকুই। ওই একরত্তি আয়োজন আরও যন্ত্রণার। সে যেন চোখে আঙুল দিয়ে দ্যাখায়, না পারাগুলো। যেন উৎসবের, উদযাপনের সাধ আছে তাদের কিন্তু সামর্থ্য নেই। যেন এই ভাতের থালায় এক অনধিকার খুশি তারা ভাগ ক’রে নিতে চাইছে – লুকিয়ে।
তবু মা’র কথা ভেবে কিছু বলে
না স্বদেশ। ফ্যাক্টরি বন্ধ হয়ে বাবার কাজ যাওয়ার পর থেকেই
মাকে খাটতে হয়। প্রথমে ঘরে ব’সে টিউশানি। তারপর বাবা মারা গেল... ২০০৭... উঁহু... স্বদেশ তখন ক্লাস সিক্স...
মানে ২০০৮... তারপরই মাকে চাকরি নিতে হয় একটা... বেসরকারি অফিসে।
বাবার ওপর হেব্বি রাগ
স্বদেশের। এমন কাণ্ডজ্ঞানহীন মানুষ, সে আর দ্যাখেনি। একটা সংসার করলো, সামলাতে পারলো না... আবার বিয়ের পর দীঘা গিয়ে
জড়িয়ে ছবিও তোলা হয়েছিলো। অথচ দ্যাখো, এখন কি অবস্থা! স্বদেশের
সমস্ত অভিযোগ গিয়ে তার বাবার ওপর পরে। বেচারা মৃত মানুষ... উঠে এসে আত্মপক্ষও নিতে পারবে না। স্বদেশ নিজেই কাল্পনিক কথোপকথন খাড়া করে। ঝগড়ার কতগুলো সম্ভাব্য প্ল্যানচেট...
– তুমি এত ইরেসপন্সিবল! দুমদাম জন্ম দিয়ে দিলে। তারপর যে ছেলের জন্য একটা দায়িত্ব থাকে, সেটা মাথায় নেই?
– কী করবো? মরে যে যাবো, তা কি আগে জানতাম? না আমার হাত ছিলো?
উঁহু উঁহু... এরকম
নয়।
– কী চূড়ান্ত দায়িত্বজ্ঞানহীন তুমি! ছিঃ...
– কেন আমি আবার কী করলাম?
না না। ধুর। মারা যাওয়ার পর ছেলের সাথে কথা বলতে এলে বাবার নিশ্চয়ই একটা গিলটি ফিল হবে, মুখটা শুকনো, অপরাধবোধ। স্বদেশ রি-কন্সট্রাকট করে ঝগড়াটা।
– কী চূড়ান্ত দায়িত্বজ্ঞানহীন তুমি! ছিঃ...
– আমি সত্যিই জানতাম না বাবা। ভেবেছিলাম অনেককিছু করবো তোদের জন্য। হঠাৎ ম’রে গেলাম।
– তুমি এটাও জানতে না, যে পনেরোই অগাস্ট স্বাধীনতা
দিবস, আর আমি ষোলো তারিখ জন্মেছি?
– তা কেন জানবো না রে? (স্নেহ প্রশ্রয় মিশে বাবার গলা কাঁপে)
– তবে আমার নাম স্বদেশ দিলে কেন?
– মাথায় এলো দিয়ে দিলাম। কাছাকাছিই তো দুটো দিন। ক্ষতি কী? কেন রে, কিছু ভুল হয়েছে?
– কী দায়িত্বজ্ঞানহীন! কী দায়িত্বজ্ঞানহীন!
আবার জিগ্যেস করে ‘কিছু ভুল হয়েছে’?
এই নামের জন্যই যত
সমস্যা। বাবার একমুহূর্তের না ভেবেচিন্তে করা কাজ, তার পুরো লাইফটাই হেল
ক’রে দিলো। স্কুল থেকে পাড়া দিনরাত হ্যাটা হতে হচ্ছে। প্রথম শুরু হয়েছিলো ক্লাস এইটে। যেদিন সুবোধবাবু তাদের ইতিহাস পড়াতে এলেন।
– নাম কী তোর?
– স্বদেশ পাল।
– বাব্বা! স্বদেশ? পনেরোই অগাস্ট জন্ম
না-কি?
– না। ষোলোই। অগাস্ট।
হে হে হো হো... ইতিহাস
স্যার তরঙ্গে হাসতে শুরু করেন। তাঁর হাসি দেখে ক্লাসের বাকিরাও। কেন এই হাসি বুঝতে পারে না স্বদেশ। এদিক ওদিক তাকায়। নিজেও অল্প অল্প হাসার
চেষ্টা করে। যেন তার জন্মদিনটা এক বিশাল কমেডি। কিম্বা তার জন্মটা। আর তা সব্বাই জেনে ফেলেছে। সে-ও সেই জানার দলে মানিয়ে নিতে, অল্প অল্প হাসে।
কিছুক্ষণ পর হাসি থামলে, স্যার বলেন,
– তুই তো ফেল করা স্বদেশ রে! পনেরোর জায়গায়
ষোলোতে জন্মেছিস! এক দিন ফেল।
সেই শুরু। এরপর সব জায়গায়। ওই তো ফেল করা স্বদেশ যাচ্ছে। দ্যাখ দ্যাখ ফেলু স্বদেশ দাঁড়িয়ে। আরে আমাদের ফেল করা স্বদেশ এবার ফিফথ হয়েছে।
কোনোদিনই পড়াশুনোয়
সে খারাপ ছিল না। বা এমন কিছু, যাতে তাকে বাকিদের
থেকে ছোট করা যায়। শুধু বাবার ওই একটা ভুল তাকে কীর’ম সবার মধ্যে আলাদা
ক’রে দিলো। যেন ‘ফেল করা স্বদেশ’ হয়েও, সে যে আর পাঁচজনের
মতো জীবন কাটাচ্ছে – এটাই এক চূড়ান্ত অন্যায়। মুখ লুকিয়ে থাকতে হতো সমস্ত জায়গায়। জলতেষ্টার মতো একটা sorry, তোতলাতে তোতলাতে শুকিয়ে
যেতো গলায়। সব সময় পালিয়ে বেড়াতো। সুড়ঙ্গ কাটতো চারপাশে। আনন্দে উচ্ছ্বাসে ভয় করতো, এই কেউ এক্ষুনি এসে
চেঁচিয়ে দেবে –
ওই তো আমাদের ফেল করা স্বদেশ। ওর জন্মদিনের আগের দিন আলো জ্বলে ওর বাড়ির সামনে, জন্মদিন অন্ধকার। আগের দিন টফি মিষ্টি বিলোনো হয়, জন্মদিন ভোকাট্টা। ওই তো।
মা-এর সাথে রাস্তায়
বের হতে ভয়। আত্মীয়-স্বজন এলে তাদের স্টেশন পৌঁছে দিতে
ভয়। যদি কেউ ডেকে দ্যায়... সবার সামনে!
রিমলির কথাগুলো এখনও
মনে আছে স্বদেশের।
– তোর জন্য আমায় শুনতে হয়। ‘ফেলু স্বদেশের গার্লফ্রেন্ড’ ব’লে ক্ষ্যাপায়।
– পাস দে। ইগনোর করলেই মিটে যায়।
– তবু তুই ওদের কিছু বলবি না?
– কী বলবো? ওরা অত জন! মারবো?
– বিন্দুমাত্র গাটস নেই তোর! কোনোদিন আর আমার
সাথে সম্পর্ক রাখবি না।
– রিমলি! বোঝ।
– শুধু আমার সাথে নয়। কারো সাথেই কখনও সম্পর্ক তৈরি করিস না। তুই সত্যিই ফেল করা। তোর সাথে যারা জড়িয়ে পড়বে, তাদেরও সেই ইনসাল্টের ভাগীদার হতে হবে, আর তুই ব’সে ব’সে আঙুল চুষবি।
এতসবের পর বাবা জিগ্যেস
করছে, ‘কিছু ভুল হয়েছে’? বারান্দার এক কোণে ব’সে পড়ে স্বদেশ। বাবা তার পাশে। মুখে ছ’
বছরের ঝাপসা দূরত্ব।
– এমনটা হবে আমি জানতাম না। সত্যি। তুই হয়তো ঠিকই বলেছিস। না ভেবে চিন্তেই নামটা দেওয়া। আসলে আমার বাবা আমার নাম রেখেছিলো বিপ্লব... বাবা ছিলো ফ্রিডম ফাইটার... তার যখন
আঠেরো, ভারত স্বাধীন হয়... স্বাধীন ভারতে জন্মানো স্বত্বেও আমার নাম কেন বিপ্লব দিলো আমি
কোনোদিনও বুঝিনি... কে জানে... হয়তো স্বাধীনতা নয় বরং বিপ্লবটাই বাবার কাছে একটা পরিচয়
ছিলো। তো আমিও ভাবলাম, বিপ্লবের ছেলে স্বদেশ...
মানাবে ভালো... তাছাড়া দিনটাও যখন স্বাধীনতার পরপরই। নাহ... বোকার মতো নামের এর’ম ব্রিজ বানাতে গিয়ে...
এত বড় একটা ভুল ক’রে ফেলেছি।
বাবাকে আর কিছু বলে
না স্বদেশ। যাক গে। যা হবার তা তো হয়েই গেছে। যথেষ্ট গিলটি ফিল করানো গেছে... ওভার। তাছাড়া কতদিন আর! সামনের বছর কোনও একটা স্কলারশিপ যে করেই হোক জোগাড় ক’রে হুশ। লোকজন হয়তো শেষবারের মতো বলবে – ফেল করা স্বদেশ আমেরিকা
পালালো।
– মা এবারও লাইট কিনে দ্যায়নি, না রে?
– তুমি কী ক’রে জানলে?
বাবা কোনও উত্তর দ্যায়
না। বুকপকেট থেকে একটা প্যাকেট বার করে ছোট। হাতে দ্যায়।
– এটা কী?
– রেডিয়াম স্টার। শোয়ার ঘরে সিলিং-এ লাগিয়ে দিস।
– সেই অন্ধকার ঘরের মধ্যে যে তারাগুলো জ্বলে, সেইগুলো?
– কখনও ঘুম ভাঙলে মনে হবে, খোলা একটা মাঠে শুয়ে
আছিস, আকাশের নিচে।
– কোত্থেকে আনলে?
বাবা হাসে। ঝাপসা দূরত্বের হাসি যেরকম হয়।
নিচে লোকগুলো পুরো
স্টেজটাই খুলে ফেলেছে। লাইটগুলোও। গোছানো হচ্ছে সব। গোটা মাঠের মধ্যে একটাই বাঁশ শুধু খাড়া, সেদিকে কারও নজর নেই। দিনের বেলা পতাকা টাঙানো হয়েছিলো ওটাতেই। এখন শুকনো ফুল আর ইঁটের মধ্যে খালি বাঁশটা দাঁড়িয়ে রয়েছে।
মিনিট কয়েক সেদিকে
তাকিয়ে থাকতেই স্বদেশের নজরে পড়ে – আরে একটা বাঁদর না! তাইতো। এত রাতে বাঁশ বেয়ে ওপরে ওঠা খেলছে। প্রতিবার এক লাফ মেরে কিছুটা ওঠে, তারপর গড়িয়ে খানিকটা নেমে
আসে। হে হে... সেই ছোটবেলার অঙ্কটার মতো। কী লম্বা প্রসেস!
অঙ্কের বাঁদরকে সামনাসামনি
দেখতে পেয়ে দারুণ মজা হয় স্বদেশের। মনে মনে আওড়াতে থাকে “একটি বানর একটি তৈলাক্ত বাঁশ বেয়ে ১ম মিনিটে ৫ ফুট উপরে ওঠে
আর তার পরের মিনিটে ৪ ফুট নিচে নেমে যায়।...”
– আচ্ছা বাবা, সময়ের এই অঙ্কটাতে, বাঁদর খালি দুটো কাজই
করতো – উঠতো আর নামতো... তাহলে জিরোতো কোন সময়?
No comments:
Post a Comment