১৬ই আগস্ট
এই
শিরোনামে লেখা চেয়েছিলেন সম্পাদক। ১৫ই নয়। অবচেতন ১৪ শুনেছিল। এবং সম্মতি। সংশয় আর একবার ফোন তুলল।
জানলাম সম্পাদক ১৬ কেই বেছেছেন। ১৫র প্রতিক্রিয়া পাঠ
করার জন্য।
বেশ
!
অবাক পৃথিবী অবাক করলে তুমি
জন্মেই দেখি টুকরো স্বদেশভূমি ।
কবি
সুকান্তের আদলে শুরু করছি। আমার কথা। আমার অনুভব। স্বাধীনতার পর
আমার জন্ম।
১৯৪৯ এর ২০ জানুয়ারি।১৫ ই আগস্ট পাড়ায়, ক্লাবে,
গৃহস্থ বাড়ির ছাদে, আর একটু বড় হতে
স্কুলেও এই দিন পতাকা উত্তোলন দেখেছি।
শুনেছি এই দিন দেশ স্বাধীন হয়েছিল। পতাকা উত্তোলনে আমরা
বাচ্চাদের কি ফুর্তি।
জলযোগে পেতাম বোঁদে। একটা ছড়াই তো ছড়িয়ে গেছিল--- বন্দে মাতরম। বোঁদে খেয়ে মাথা গরম।
দোহাই। নেহাতই নির্বিষ এই ছড়া।
কোন দেশ বিরোধী চক্রান্ত এতে প্রছন্ন নেই। ঋষি বঙ্কিমকে কোন
অসম্মান নেই। দেশ মাতাকে অশ্রদ্ধাও নেই।
কোন উস্কানি নেই সে রকম। ১৬ আগস্ট আবার থোড় বড়ি খাড়া, স্কুল,
কলেজ, অফিস, আদালত,
গয়ংগচ্ছ আর গড্ডলিকা।
ভারতে
জন্ম ভুল নয়, বড় হতে হতে বুঝলাম, বুঝতে শুরু করলাম ভুল
ভারতবর্ষে আমার জন্ম । যে বাংলার আকাশভরা
সূর্য তারা নিয়ে কবিতা লিখেছেন রবি ঠাকুর তা আমার জন্য অনেক সংকীর্ণ এখন। যে বাতাসে নিশ্বাস নিয়েছেন আমার পূর্বজরা তা অপ্রতুল। আমার পায়ের তলার মাটি এখন অপরিসর। ভাবতে
গেলে দম আটকে আসে। ভারত পাকিস্তান কে কার ভাগে পড়ল এই দোলাচলে যশোর খুলনা আর
মুর্শিদাবাদে, কাছাড়েও পতাকা তুলতে দু একদিন দেরী হয়েছিল। তা
১৬র প্রতিফলিত গৌরব। নিজস্ব না।
অবাক পৃথিবী অবাক করলে আরও
দেখি তাই নিয়ে মাথাব্যথা নেই
কারও।
বড়
হতে হতে ক্রমে বুঝলাম বাকি ভারতে এই ব্যথার কোন দোসর নেই।
আমার সোনার বাংলা যেমন গেয়েছি, গেয়েছি ভারত আমার জননী আমার। অথচ যার অঙ্গহানি করে এই স্বাধীনতা সেই ধনধান্যে পুষ্পে
ভরা স্বপ্ন ও স্মৃতির টুকরো , কাঁটাতার যখন
পায়ে বিঁধেছে, কাতরে উঠেছি যন্ত্রণায়, ডুকরে উঠেছি কান্নায় কেউ কান পাতে নি। উদ্বাস্তুর
ঢল নামল এ বাংলা মানে অবশিষ্ট বাংলায়। সাহায্য দুরের কথা
বাংলা কথাটি মোছার জন্য বাংলাবিহার সংযুক্তির প্রস্তাব এল।
বিধান রায় মশাই প্রায় রাজীও হয়ে গেছিলেন। ভাগ্যিস গণ আন্দোলনে
তিনি পিছু হটলেন।
হিসাবের খাতা যখনই নিয়েছি
হাতে
দেখেছি ওপার বঞ্চনা
লেখা তাতে।
ক্লিশে
শোনাচ্ছে? বৃদ্ধ বয়সে দিল্লীর রাজপথে বেঘোরে প্রাণ হারানো খ্যাতনামা সাংবাদিক
রঞ্জিত রায়। তাঁর Agonie of West Bengal পড়ুন আবার। তবে শুধু অর্থনীতির স্তরে বিপন্ন তা নয় সমূহ সর্বনাশ
অসহিষ্ণুতা ঘনাল ভাষায়। সংস্কৃতিতে। এল
উগ্র হিন্দীয়ানা। নিছক রাজভাষা মানে কি official language হিন্দীকে
রাষ্ট্রভাষা বলে চালানোর, চাপিয়ে দেওয়ার চক্রান্ত শুরু হল
সরকারী সহযোগিতায়।
বিদ্রোহ আজ বিদ্রোহ চারিদিকে ---
কথাগুলি
এভাবে লিখতে পারলে ভাল লাগত। বিদ্রোহ যেটুকু
দক্ষিণে। দক্ষিণ ভারতে। বাংলার তখন নুন আনতে পান্তা ফুরোচ্ছে।
এটা বাস্তবতা। কিন্তু অজুহাত হতে পারে না।
ভাষার প্রশ্নে বাংলার একটি উদাসীন পরম্পরা আছে।
মুঘল আমলে সে ফারসি শিখেছে। বাংলা ভাষা রাজভাষার
মর্যাদা পেয়েছে ত্রিপুরা আর কাছাড় রাজসভায়। ভাষা নিয়ে তার যা কিছু অভিমান দানা বাঁধল ওপার বাংলায়। পরিণাম বাংলাদেশ। বাঙালী জাতিসত্তা। ভুল আসামের ঈশান বাংলার শিলচর ভাষা যুদ্ধে এগারো শহীদ
দিয়েছে। দুনিয়ায় ভাষা আন্দোলনের প্রথম মহিলা শহীদ কমলা ভট্টাচার্য
শিলচরের। কাছাড়ে সরকারী ভাষার স্বীকৃতি তারা প্রাণ দিয়ে আদায়
করেছিল।
চাকরি
সূত্রে আসামের তিনসুকিয়া আর কাছাড়ের শিলচরে বহুবছর কাটিয়েছি।
তিনসুকিয়ায় যখন ছিলাম আসুর দাপট। ভাষার প্রশ্নে তাদের
অসহিষ্ণুতা হাড়ে হাড়ে টের পেয়েছি। বঙ্গালি খেদার জেরে
আসামের প্রশাসন তখন ওড়িয়াদের কাছে টানছে। আমার অফিসের তিওয়ারি
মাড়োয়ারি। বাড়ি উড়িষ্যার কটকে। সে
অসমীয়াদের এই মনোভাবে অন্যায় দেখে নি। রাজ্যটা যখন আসাম তার
কোণায় কোণায় একটাই ভাষা রাজ করবে। ভুল কোথায়?
তিওয়ারিকে
সেই পরিস্থিতিতে বলতে পারি নি আসাম জন্মই নিয়েছে ব্রিটিশ ভারতে। আসাম ভাষা ভিত্তিক মানে গঠিত নয়।
বহুভাষিক রাজ্য। অসমিয়ারাই বরং সংখ্যালঘু।
কাছাড় ছাড়া ভারতে কোথাও দেশভাগের প্রশ্নে গণভোট হয় নি।
কাছাড়। একদা শ্রীহট্টের অংশ।
বঙ্গভঙ্গের ছকের আগেই যা কিনা বাংলা থেকে কেটে নতুন রাজ্য আসামে জুড়ে দেওয়া হয়েছিল। অসমিয়ারা হীন ভাষাগত স্বার্থে পুরো কাছাড় পাকিস্তানে যাক
চেয়েছিল। চাবাগানের বাঙ্গালিদের ভোট দিতে দেওয়া হয় নি। তবু সিলেটের তিনটি থানা ভারতে থেকে গেল। ভাষায় আবহমানের বাঙালী এই জনপদ ওপার থেকে ভিটে মাটি
হারানো ভাইদের আশ্রয় দিয়েছে। সব হারানো মানুষ
মুখের ভাষা হারাতে রাজী হয় নি। পরবর্তী সময়ে শিলচরে
চাকরি সূত্রে সেই তীর্থ দর্শন করেছি। সে গল্প অন্য।
সন্দ্বীপে
মহাপ্রলয়। বন্যা। তিওয়ারি এবার যা
বলেছিল আরও মারাত্মক। ভাগ্যিস দেশ ভাগ হয়েছিল। নইলে এই লাফড়ায় ভারতের রাজকোষ খালি হয়ে যেত। দেশ ফতুর হয়ে যেত! বাংলার প্রশ্নে তিওয়ারির কণ্ঠে আমরা
বাকি ভারতকে শুনছি কিন্তু। এতোটাই অমানবিক। এতোটাই অকৃতজ্ঞ। আন্দামান সেলুলার
জেলের বন্দীরা ছিলেন নব্বই শতাংশ বা তার বেশী বাঙালী।
স্বাধীনতার জন্য তার এত ত্যাগ তিতিক্ষা মূল্য পেল কই? তিওয়ারিকে
অবশ্য জবাব দিয়েছিলাম-- রাজস্থান মানে রেগিস্তানের জন্য
ভারতের রাজ কোষ থেকে খরচ হয় কত?
আমার সোনার বাংলা
কবি
এই গানে সাবেক বাংলা সমগ্র বাংলাকে সম্বোধন করেছিলেন।
এখন খণ্ডিত বাংলার জাতীয় সংগীত। মাটি সার্বজনীন মা। আমার বাবা, আমার পূর্বপুরুষেরা যাকে মা ডেকেছেন
সেই সমগ্র বাংলা আমারও মা নয় কি? অবশিষ্ট বাংলা আমার মা,
ওপার বাংলা সৎমা? ওপারে বাংলা
রাষ্ট্রভাষা। বাঙালী জাতিসত্তার বিকাশ হয়েছে। এপারে আমাদের বাঙালী পরিচয়ে গ্রহণ লাগল?
ইংরেজি
বাদ দিলে বাংলাই তাহলে ভারতে প্রচলিত একমাত্র বিদেশী ভাষা।
একটা ঘটনার কথা বলি। অফিস ক্লাবের নাট্য উৎসবে দক্ষিণ
ভারত থেকে এসেছেন বন্ধুরা। খুব সরল ভাবে তারা
প্রশ্ন করে বসলেন বাংলায় মানে পশ্চিম বাংলায় বাংলা এই বিদেশী ভাষা চলে কেন?
হিন্দি,
হিন্দু, হিন্দুস্তাদাবি
কানের
কাছে ভারতে এই কথা শুনতে শুনতে বড় হয়েছি। কথাটি শুনলে এখনও বমি
পায়। কি বিপদ!
জনগণমন। এ দেশের জাতীয় সঙ্গীত।
একটা কুইজ প্রতিযোগিতা করলে কেমন হয়? গানটি কার লেখা এর উত্তরে অন্তত টেগোর
নামটি পাওয়া যাবে? কোন ভাষায় লেখা? সারা ভারতে এমনকি আজকেরহত পশ্চিম বাংলায় ইং-মিডিয়াম
স্কুল গুলিতে সঠিক উত্তর পাওয়া যাবে না আমি নিশ্চিত।
চাকরি সূত্রে ভারতের নানা রাজ্যে কাজ করেছি। এই প্রশ্নে কেউ
বলেছেন সংস্কৃতে লেখা। বেশীর ভাগের দাবি হিন্দি।
বেশী
কথা কি জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের পি জিও যখন এই দাবি করেন থতমত খেতে হয় বই কি। অফিসের আরও উচ্চপদস্থ জোনাল ম্যানেজার অবশ্য জানিয়েছিলেন
গানটি বাংলায় লেখা। হিন্দি অনুবাদটি গাওয়া হয়।
হিন্দিভাষী এক সহকর্মী আফসোস করেছিলেন রবিন্দরজি বেকার বাংলায় লিখলেন। হিন্দিতে লিখলে সারা ভারতে কদর পেতেন। অমিতাভ বচ্চনের বাবার মত।না। আমি একটুও বানিয়ে বা বাড়িয়ে বলছি না।
শিলচরে আমার এক সহকর্মী যে বিহার ছাপরার লোক জানতে আমার ৬ মাস সময় লেগেছিল। এত নিখুঁত তার সিলেটি উচ্চারণ। এ
বাংলায় আমরা কারণ ছাড়াই হিন্দিতে টিকেট কাটি।
চায়ের দোকানের শিশু শ্রমিককে বলি এক কাপ চায় লাও।
আমি ঐ শিশুটির এ বাংলায় কাজের বিরুদ্ধে নই। যদিও শিশুশ্রম বে-আইনি। আমি ঐ শিশুটিকে হিন্দিতে কথা বলে স্বস্তি দেওয়ার বিরুদ্ধে। সারা ভারতে আহা আমি বাঙালী এই বিবেচনায় এই বিবেচনায় আমার
সাথে তো কেউ বাংলায় কথা বলে নি। হিন্দি যোগাযোগের
ভাষা? তো রাষ্ট্রভাষা এই ধাপ্পার প্রচার রাজকোষের খরচায় জারী আছে কেন?
বিশ্বে বিদেশের দূতাবাসে কোথাও বাংলায় এমনকি রবি ঠাকুরের
গীতাঞ্জলীও রাখা নেই। বাংলা সাহিত্যের
প্রথম ভুবন এখন ঢাকা। মোদ্দা কথা এ মাটিতে যে বাস করছে
সে নিজের দায়েই বাংলা শিখুক। উলটে এখানেও শিশুকে
বাংলা ভোলানোর চেষ্টায় প্রাণপণ চেষ্টায় রত অভিভাবক যারা।
সারা দেশে সব রাজ্যে আসামে
অসমীয়া ওড়িষ্যায় ওড়িয়া মহারাষ্ট্রে মারাঠি গুজরাতে গুজরাতি --- দক্ষিণে
কন্নড় বা মালয়লম বা তামিল-- স্কুল স্তরে তো বটেই কোথাও
কলেজ স্তরেও অবশ্যপাঠ্য। বাংলা ব্যতিক্রম। এখানে বাংলার ছেলেও মাতৃভাষা না শিখেই উচ্চশিক্ষা পেতে
পারে।
বাঙালী তথা অ-হিন্দিভাষীরা
কি দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিক?
অপ্রিয়
হলেও এটাই বাস্তব। মাতৃভাষা হিন্দি এই সুবাদে একজন হিন্দিভাষী সব সরকারি
চাকরি পরীক্ষা হিন্দিতে দিতে পারছেন। এতে কি হিন্দিভাষীরা
অতিরিক্ত সুবিধা পাচ্ছেন না? এটা কি ন্যায়সংগত?
নাতিদীর্ঘ উপসংহার
গত
বছর নাতি জন্মাল আমেরিকায়। ডাক্তার সিসেনিয়াস, আদতে গ্রীক,
অভিনন্দন জানিয়ে বললেন--- নাতি ইংরেজি
শিখবে এমনিতেই। হিন্দিটা শেখাবেন। বিনয়ের সঙ্গে বললাম ভারত অনেক রাজ্যের সমাহার। অনেক ভাষা। আমরা পশ্চিম বাংলার। ভাষা বাংলা। ডাক্তার হেসে বললেন-- জানি। আমার অনেক ভারতীয় বন্ধু আছেন।
কিন্তু বাংলা তো মাইনর ল্যাঙ্গুয়েজ।
পতনের শব্দ
মানুষের
পতনের কোন শব্দ হয় না। আমি কিছু শব্দ চয়ন করলাম মাত্র। ১৬ই আগস্ট যে অধঃপতনের শুরু জানি না কি করে রুখব? আগ্রাসী
হিন্দু হিন্দি হিদুস্তানের শ্লোগানে তাল মেলাতে অক্ষম যদি আমি আগে বাঙালী তারপর
ভারতীয় এ রকম ভাবতে চাই তা কি দেশদ্রোহ?
No comments:
Post a Comment