COME TO www.dolchhut.org

১৬ই আগস্ট, ১৯৪৭ : এক অফুরন্ত অভিশাপ অনুপম মুখোপাধ্যায়

১৬ই আগস্ট, ১৯৪৭ : এক অফুরন্ত অভিশাপ
অনুপম মুখোপাধ্যায়

১৬ই আগস্ট, ১৯৪৭ এই তারিখের গুরুত্ব আমাদের সমাজে, আমাদের সংস্কৃতিতে, আমাদের রাজনীতিবোধে, আমাদের ব্যক্তিগত ও সামূহিক মনঃস্তত্ত্বে অপরিসীম এ নিছক এক তারিখ নয় বিগ্রহ এবং আইরনির ধারণার বাইরে গিয়ে এ এক বহমান ইতিহাস হ্যাঁ, ১৬ই আগস্ট একটি তারিখ, যা বয়ে চলেছে, আজও আমাদের ক্যালেন্ডারের কোনো তারিখ তাকে না ছুঁয়ে থাকতে পারছে না ওই তারিখেরই নাম উত্তর-উপনিবেশ তার শেষ কোথায়?
এটা অবশ্যই ঠিক নিজের ধর্মে মৃত্যুও শ্রেয়, পরধর্ম ভয়াবহ ইংরেজের শক্ত শাসনের চেয়ে সেভাবেই আমাদের নিজেদের দেশের মানুষের ঢিলে শাসনও আমাদের কাছে সম্মানজনক স্বাধীনতা যখন সম্মানের অন্য নাম হয়ে যায়, আমি সত্যিই আমাদের জাতীয় পতাকার দিকে গর্বের সঙ্গে তাকাই ওই পতাকার তলায় জমেছে বহু রক্তস্রোত ওই আত্মবলিদানকে অপমানিত করার দুঃসাহস যেন কারো না হয় কুকুর এবং দেশিদের প্রবেশ নিষেধ ... এই সাইনবোর্ড আমাদের পূর্বপুরুষকে সহ্য করতে হয়েছিল, ভাবলেই রক্ত গরম হয়ে ওঠে হাতে একটা পিস্তলের বাঁট অনুভব করি বুঝতে পারি অপমানের কোন স্তরটাকে উপলব্ধি করতে পারলে ওই সোনার ছেলেরা আগুনে ঝাঁপ দিতে পারতেন, নিজের মা, স্ত্রী, পিতা, সন্তানের চেয়ে ঢের মূল্য দিয়ে নিজের মাটিকে
তবু, ১৬ই আগস্ট, ১৯৪৭ একটা দিন ওই দিনে কী ঘটেছিল, কতখানি রক্তে কতখানি পিছল হয়েছিল, সচেতন মানুষ মাত্রই জানেন এমন ব্যক্তিরাও আমাদের প্রজন্মে দেখা দিচ্ছেন যারা ভাবেন গান্ধী নামক ব্যক্তিটি আসলে এক কল্পনা মাত্র, আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রাম সম্পর্কে বিন্দুমাত্র অবহিত না হয়েই তাঁরা বেঁচে থাকছেন, সমৃদ্ধ হচ্ছেন, সন্তানের দায় নিচ্ছেন সত্যিই এমন মানুষ আছেন, আমি বলতে পারি আমাদের সমাজে undead মানুষের সংখ্যা ক্রমেই বাড়ছে এ অধুনান্তিকের অবদান অধুনান্তিক পরিসর পেরেছে চলমান মৃতদেহদের জ্যান্ত প্রতিপন্ন করতে আজ আমরা সত্যিই আধুনিক হতে ভুলে গেছি আর আমাদের বিস্মরণের প্রতীক হতে পারে ১৬ই আগস্ট, ১৯৪৭ ওই তারিখ থেকে আমরা স্বাধীনভাবে অন্ধ হতে শিখি, সেই শিক্ষা এখনও চলছে
পাঠক এতদূর অবধি পড়েই কি বুঝতে পারলেন, আমি ভারতবর্ষের স্বাধীনতা নিয়ে আদৌ গর্বিত নই? আমি গর্বিত আমার দেশের বিপ্লবীদের আত্মবলিদানে, আমাদের সংগ্রামীদের অত্যাচার সহ্য করার ক্ষমতায় কিন্তু সেই সঙ্গেই আমি মনে করি না, যে সময় স্বাধীনতা আমাদের দেওয়া হয়েছিল, আমরা স্বাধীনতা লাভ করতে সমর্থ আদৌ ছিলাম যে দেশটা স্বাধীনতা পেয়েছিল, তার নাম ভারতবর্ষ হতেই পারে না সে একটা খন্ডিত দেশ টেবিলের উপরে যেভাবে কেককে টুকরো করা হয়, ঠিক সেভাবে যে দেশটা আমরা পেলাম, তার মধ্যে তখনই কোনো সংহতির ধারণা ছিল না, এখনও নেই
বড্ড তাড়াহুড়ো করা হয়েছিল দেশের আকারটা নির্ণয় করার জন্য সর্দার প্যাটেলের ভূমিকা আশা করি আমরা সকলেই জানি হয়তো এটাও জানি, কংগ্রেস এবং মুসলিম লীগের নেতারা কতখানি অধৈর্য ছিলেন ক্ষমতাটা পাওয়ার জন্য ক্ষমতা একমাত্র ক্ষমতাই পারে স্বাধীনতার ধারণার কাছাকাছি যেতে সেটা আমাদের জনতা পায়নি জনতা শুধু কালো পোশাকে সাদা নেতার বদলে কালো নেতাদের সাদা পোশাকে সিংহাসনে দেখেছিল নেতা বেছে নেওয়ার সুযোগের নামে প্রতারিত হওয়ার সুবিধা তাদের দেওয়া হয়েছিল, আজও দেওয়া হয়
সেই থেকে আজ অবধি ১৬ই আগস্ট হয়ে আছে যে কোনো তারিখ আমাদের প্রতাপ আজও শেষ কথা বলতে চাইছে
সবচেয়ে যে ব্যাপারটা মেনে নেওয়া যায় না, স্বাধীনতার আগে একজন ভারতীয় একজন অর্ধেক দেশি এবং অর্ধেক আন্তর্জাতিক হয়ে ওঠার শিক্ষাটা পেতেন এমনকি বিদ্যায়তন থেকেই শিক্ষাটা তখন চাকরির উদ্দেশে হলেও সেখানেই থেমে থাকত না সাহিত্যের মর্যাদা এই কারণেই শিক্ষিত সমাজ করতে পারতেন আজ শিক্ষিত আর মূর্খের কোনো বিদ্যায়তনিক ফারাক নেই আজ একজন প্রকৃত শিক্ষিত মানুষ একমাত্র স্বশিক্ষিত মানুষ আলিমুদ্দীন, কালীঘাট, দিল্লি, আর গুজরাটের বাতাসকেই আমরা আমাদের একমাত্র অভিমুখ হিসেবে মেনে নিতে পারছি, কারণটা সোজা... আমরা মূর্খ হয়ে থাকতে আর লজ্জাবোধ করি না, শিক্ষিতের ধারণাই গেছে মুছে
ব্রিটিশ নিয়েছিল অনেক, হয়তো আমাদের আত্মসম্মানও দাবি করেছিল কিন্তু, তারা চলে যাওয়ার পরে, কে বা কোন রাজনৈতিক দল আমাদের আত্মসম্মান কিনতে চায়নি, বলতে পারেন? ক্ষুদিরাম, প্রফুল্ল চাকী, বাঘা যতীন, বিনয়-বাদল-দিনেশ... এঁদের প্রণাম করেই বলতে চাই, আমার মনে হয় না লর্ড কার্জন একজন শাসক হিসেবে সিরাজ বা আলিবর্দীর চেয়ে নিকৃষ্ট ছিলেন আমি মনে করি আমরা যেটুকু আলো পেয়েছি, তা আমাদের প্রাক্তন শ্বেতাঙ্গ  শাসকদেরই দান তারপর আলো আর আলেয়ার ফারাক মুছে দেওয়া হয়েছে সুকৌশলে জওহরলাল, ইন্দিরা গান্ধী, রাজীব গান্ধী, ভি পি সিং, দেবগৌড়া, অটলবিহারী, নরসীমা, মনমোহন, বা নরেন্দ্র মোদীর থেকে নয় এঁরা অনেক বিকাশ করেছেন আমাদের দেশের জওহরলালের আমলে যে শিল্পবিস্তার হয়, তার জন্য চিরকৃতজ্ঞ থাকতে হবে আমাদের দেশের প্রতিটি প্রধানমন্ত্রী তাঁর অবদান রেখেছেন কিন্তু আলোটা ফেরাতে পারেননি আমাদের বিবেক আর মননের
১৬ই আগস্ট, ১৯৪৭ একটা বিশ্রী জন্মদাগ আমার মতে আমাদের দেশটা নিজের পায়ে দাঁড়ানোর জন্য আরো কয়েকটা বছর অপেক্ষা করতে পারত যখন তাকে তথাকথিত স্বাধীনতা দেওয়া হয়েছে তার একটা সংবিধান অবধি ছিল না পরে সেটা ফোটোকপি করে বানানো হয় ব্রিটিশদের থেকে, শুধু কিছু কলম চালিয়ে সেটাকে গেঁথে দেওয়া হয় জনসমাজে আরেকটু যদি ধৈর্য ধারণ করতেন আমাদের উদগ্রীব কৃষ্ণাঙ্গ প্রভুরা, তাহলে একটি সমর্থ শিশুর জন্ম হত সেই সময় তাকে দেওয়া হয়নি অসম্পূর্ণ অবস্থায় টেনে বের করে আনা হয়েছে, কেটে দেওয়া হয়েছে টুকরো-টুকরো করে, তারপরে জুড়ে দেওয়া হয়েছে কিছু ইচ্ছুক বা অনিচ্ছুক অঙ্গপ্রত্যঙ্গ, এমনকি তার যখন শ্বাস নেওয়ার ক্ষমতাটাও ঠিকঠাক তৈরি হয়নি তার ফল আমরা ভুগছি আরো হয়তো একটি শতাব্দী লাগবে শুধু সেই ঘাটতি পূর্ণ করতে, একটা অখন্ড এককাট্টা একরোখা দেশ পেতে
১৬ই আগস্ট, ১৯৪৭ নামক অফুরন্ত অভিশাপটির প্রতি আমার এই মানসিকতার কারণে আমাকে যদি দেশদ্রোহী ভাবেন, বধযোগ্য সাব্যস্ত করেন, আমি অসহায়


2 comments:

Jinat said...

ব্রিটিশ নিয়েছিল অনেক, হয়তো আমাদের আত্মসম্মানও দাবি করেছিল। কিন্তু, তারা চলে যাওয়ার পরে, কে বা কোন রাজনৈতিক দল আমাদের আত্মসম্মান কিনতে চায়নি, বলতে পারেন? Eituku bojhar Moto gonotantrik sikhya na asikhya kar nei???? Kintu আমরা মূর্খ হয়ে থাকতে আর লজ্জাবোধ করি না, শিক্ষিতের ধারণাই গেছে মুছে। khub prasonghik laglo lekhata,,eti bujhi swadhinota nie best post ja Amar porar sujog elo.,,

anupam mukhopadhyay said...

ধন্যবাদ জিনত